
“সত্য বল, সুপথে চল ওরে আমার মন।
সত্য সুপথ না চিনিলে পাবিনে মানুষের দরশন”—
ফকির লালন শাহের এই অমর বাণীসমৃদ্ধ গান দিয়েই যেন এক অনন্য সংগীতযাত্রার সূচনা হয়েছিল সংগীতশিল্পী ফরিদা পারভীনের। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সত্তরের দশকের শুরুর দিকে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় দোল পূর্ণিমার এক মহাসমাবেশে প্রথমবারের মতো লালনের এই গানটি পরিবেশন করেন তিনি। গুরু মকছেদ আলী সাঁইয়ের অনুরোধে কিছুটা অনীহা নিয়েই লালনভক্তদের সামনে গানটি গাইলেও, সেই পরিবেশনা বদলে দেয় লালন সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। গান শেষ হলেও ফরিদা পারভীনের মনে রয়ে যায় এক গভীর ঐশ্বরিক অনুভব। সেই শুরু থেকেই তিনি হয়ে ওঠেন ‘লালনকন্যা’ ফরিদা পারভীন।
প্রয়াত এই কিংবদন্তি শিল্পীর জন্মদিন (৩১ ডিসেম্বর) উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় আয়োজন করা হয় ‘কিংবদন্তি ফরিদা পারভীন’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে ফরিদা পারভীনের প্রতিষ্ঠিত সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘অচিন পাখি সংগীত একাডেমি’। আয়োজকরা জানান, দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত দিনে অনুষ্ঠান আয়োজন সম্ভব না হওয়ায় পরবর্তীতে এটি আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে অচিন পাখি সংগীত একাডেমির শিক্ষার্থীরা যখন ‘সত্য বল সুপথে চল’ গানটি পরিবেশন করেন, তখন মুহূর্তেই জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা যেন ফিরে যান পাঁচ দশক আগের ছেঁউড়িয়ার লালন ধামে। পরবর্তীতে একে একে পরিবেশিত হয় ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’, ‘সর্বসাধন সিদ্ধ হয় তার’, ‘মিলন হবে কত দিনে’ ও ‘ধন্য ধন্য বলি তারে’—এমন একাধিক লালনগীতি। প্রতিটি গানের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংক্ষিপ্ত ধারাবর্ণনা লালন দর্শন ও ফরিদা পারভীনের সংগীত সাধনাকে নতুন মাত্রায় উপস্থাপন করে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রয়াত ফরিদা পারভীনের প্রতিকৃতিতে প্রদীপ প্রজ্বালনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, অচিন পাখি সংগীত একাডেমির সভাপতি এবং প্রয়াত ফরিদা পারভীনের স্বামী, বিশিষ্ট বংশীবাদক গাজী আব্দুল হাকিমসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে আলোচনাসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, “ফরিদা পারভীন সত্তরের দশকেই তরুণ বয়সে ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’সহ লালনের গান গেয়ে এ ধারাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।”
অনুষ্ঠানে অন্যান্য অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আলহাজ্জ লায়ন খান আকতারুজ্জামান এমজেএফ। তিনি বাংলা একাডেমি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট, উমেশচন্দ্র পাবলিক লাইব্রেরি, খুলনা ডায়াবেটিক সমিতি, খুলনা শিশু হাসপাতাল, খুলনা লায়ন্স ক্লাব এবং বাংলাদেশ লায়ন্স ফাউন্ডেশন (বিএলএল)-এর আজীবন সদস্য। পাশাপাশি তিনি লায়ন্স ক্লাব অব ঢাকা ক্যাপিটাল গার্ডেন-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর উপস্থিতি অনুষ্ঠানে ভিন্নমাত্রা যোগ করে।
অনুষ্ঠানজুড়ে সংগীত, আলোচনা ও স্মৃতিচারণের মাধ্যমে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় বাংলা লোকসংগীতের এই কিংবদন্তিকে—যিনি লালন দর্শনকে কণ্ঠে ধারণ করে পৌঁছে দিয়েছেন সাধারণ মানুষের হৃদয়ে।
www.banglarnews71.com
Copyright © 2026 Banglar News 71. All rights reserved.